মোঃ রেজাউল ইসলাম, বিশেষ প্রতিনিধিঃ বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার পলাশপোল গ্রামের একটি ঐতিহ্যবাহী মেলার নাম হচ্ছে গুড়পুকুরের মেলা, যার বয়স প্রায় ৩০০ বছর বলে অনুমিত হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সাতক্ষীরা জেলার পলাশপোল গ্রামই হলো মেলার মূল কেন্দ্রস্থল। সাধারণত পলাশপোল স্কুলের মাঠেই এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়। বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী ভাদ্র মাসের শেষে অনুষ্ঠিত হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মনসা পূজাকে কেন্দ্র করে একমাসব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় এই মেলা।

বাংলার আবহমান কালের সকল গ্রাম্য মেলার মতোই এই মেলায়ও বিভিন্ন জিনিসের পসরা বসে। কাঠ, মাটি, বাঁশ, বেত আর লোহার সামগ্রীতে ঠাসা এই মেলার প্রধান আকর্ষণ থাকে সাতক্ষীরার নানা প্রজাতির কলম-করা-গাছগাছড়া।
ঢাকা, ফরিদপুর, বাহ্মণবাড়িয়া থেকে আসেন স্টেশনারী পণ্যের বিক্রেতারা। কলম-করা-চারা আর আসবাবপত্র ছাড়াও মেলায় থাকে শিশুদের বিভিন্ন খেলনা; থাকে বিভিন্ন মৌসুমী ফল, থাকে গৃহস্থালী উপকরণ (ঝুড়ি, ধামা, কুলা, বাটি, দেলকো, শাবল, খোন্তা, দা, ছুরি, কোদাল প্রভৃতি)।

এছাড়া বিনোদনের জন্য থাকে নাগোরদোলাসহ বিভিন্ন আয়োজন। যেমন- সার্কাস, যাদু প্রদর্শনী, পুতুল নাচ এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। একসময় কলকাতা ও লন্ডন থেকে ব্যবসায়ীরা এই মেলায় আসতেন। সাতক্ষীরা পৌরসভা ও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। মূলত হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের উৎসবকে কেন্দ্র করে এই মেলা অনুষ্ঠিত হলেও সাতক্ষীরা শহরবাসীর জন্য এই মেলা হয়ে উঠছে গরিব-ধনী, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এক মিলনমেলা।
প্রতিবছর বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুসারে ভাদ্র মাসের শেষদিনে অনুষ্ঠিত হয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মনসা পূজা। এই পূজাকে কেন্দ্র করে ৩০০ বছরের বেশি সময় ধরে সাতক্ষীরায় অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে এই 'গুড়পুকুরের মেলা'। তবে কে বা কারা মেলাটির গোড়াপত্তন করেছিলেন তার কোনো ঐতিহাসিক দলিল পাওয়া যায় না।

তবে জনশ্রুতি রয়েছে শহরের পলাশপোলে একটি গোলাকৃতির পুকুরের পাড়ে বট গাছের নিচে একবার এক ক্লান্ত পথিক বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। গাছের ফাঁক দিয়ে আসা রোদ পথিকের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাচ্ছিলো দেখে এসময় একটি বিষধর সাপ ফণা তুলে তাকে ছায়া দেয়। পথিক এই দৃশ্য দেখে [হিন্দু ধর্মমতানুসারে] মনসার উদ্দেশ্যে পূজা দেওয়া শুরু করেন অথবা এলাকার লোকজনকে মনসা পূজা করতে বলেন।
এই পূজার মিষ্টি প্রসাদ পুকুরে ফেলে দেওয়ায় পুকুরের পানি মিষ্টি হয়ে যায়। এই বিশ্বাস থেকে গোলাকৃতি পুকুরের নাম হয়ে যায় গুড়পুকুর। সেই থেকে শুরু হয় গুড়পুকুরের মেলা। এলাকার প্রবীণেরা তাদের বাল্যকাল থেকেই এ মেলা দেখে আসছেন বলে জানা যায়।
তবে গুড়পুকুর নামকরণের অন্যান্য অভিমতও রয়েছে। যেমন- কারো মতে পুকুরে মনসা পূজার বাতাসা ফেলা হতো আর ঐ বাতাসার জন্য পুকুরের পানি মিষ্টি লাগতো বলেই এধরনের নামকরণ। কারো মতে, পুকুরটিতে পানি থাকতো না বেশিদিন; পরে স্বপ্নে দেখা গেলো পুকুরে ১০০ ভাড় গুড় ঢালতে হবে, আর সেমতে কাজ করার ফলেই পুকুরে পানি এলো, তাই এই নামকরণ। আবার শোনা যায়, পুকুরের তলদেশ থেকে একসময় মিষ্টি পানি উঠতো বলে এমন নামকরণ। কারো মতে পুকুরের পাড়ে একসময় প্রচুর খেজুর গাছ হতো। একবার সব গাছের রস সংগ্রহ করে তা দিয়ে গুড় তৈরি করে তার বিক্রীত মূল্যে খনন করা হয় এই পুকুর। আর সেই থেকেই এই পুকুরের নাম গুড়পুকুর। তবে ঐতিহাসিক আবদুস সোবহান খান চৌধুরীর মতে, চৌধুরীপাড়ার রায় চৌধুরীরা গৌরবর্ণের ব্রাহ্মণ ছিলেন। তাই তাদের পুকুরকে বলা হতো গৌরদের পুকুর। সেই 'গৌরদের পুকুর'-ই কথার বিবর্তনে হয়ে যায় 'গুড়পুকুর'।

মেলাটি আবহমান কাল ধরে চলে এলেও ২০০২ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ সেপ্টেম্বর মেলা চলাকালে শহরের একটি সিনেমা হল আর সাতক্ষীরা স্টেডিয়ামে সার্কাসের প্যান্ডেলে বোমা হামলা করে জঙ্গীরা। এই ঘটনায় ৩ জন নিহত হয়, আহত হয় শতাধিক নারী-পুরুষ আর শিশু। এর ফলে ৬ বছর ধরে মেলা পরিচালনার অনুমতি না পাওয়ায় মেলা বন্ধ ছিলো। অবশেষে ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দে আবার শুরু হয় এই মেলা। মেলা সাধারণত এক মাসব্যাপী অনুষ্ঠিত হলেও ঐবছর মেলা ১০ দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়।
উল্লেখ্য, মেলার শালীনতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে স্থানীয় প্রশাসন মেলায় অশ্লীল নৃত্য, জুয়া খেলা, হাউজি ও লটারি খেলাকে নিষিদ্ধ করেছে। এমনকি যাত্রাও সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ।
ই-পেন চেম্বারঃ আলতাফ টাওয়ার (৩য় তলা), ১নং বয়রা ক্রস রোড, সোনাডাঙ্গা, খুলনা।
ই-মেইলঃ news@dailyjonoshruti.com, editor@dailyjonoshruti.com
মোবাইলঃ +৮৮-০১৬১৪-৪৯৪৪৪৫, +৮৮-০১৬১৪-৪৯৪৪৪৬
© ২০২২–২০২৫ দৈনিক জনশ্রুতি। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। "দৈনিক জনশ্রুতি: আমাতুল্লাহ মার্ট-এর ভাবনাপ্রবাহে নির্মিত।"