কাওছার হোসেন | দৈনিক জনশ্রুতি
কেশবপুরের কল্লোল কুমার দাস সড়ক দুর্ঘটনায় ডান হাত হারিয়েও থেমে যাননি। বাম হাতে লিখে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর এখন জীবিকার তাগিদে বেকারির পণ্য নিয়ে পথে পথে ঘুরে বিক্রি করছেন তিনি। ভিক্ষাবৃত্তির পরিবর্তে নিজের শ্রমে উপার্জন করে পরিবারের দায়িত্ব পালন করা তাঁর জীবনসংগ্রাম আত্মমর্যাদা, পরিশ্রম ও অদম্য মনোবলের এক বাস্তব উদাহরণ।
কল্লোল কুমার দাস যশোরের কেশবপুর সদর ইউনিয়নের মাগুরাডাঙ্গা গ্রামের স্বপন কুমার দাসের ছেলে। সংসারের ব্যয়ভার বহনের তাগিদে প্রতিদিন বেকারির পণ্য নিয়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি। ত্রিমোহিনী, সাতবাড়িয়া, মূলগ্রাম, বাইশাসহ কেশবপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে পণ্য বিক্রি করেন। প্রতিকূল আবহাওয়া, শারীরিক সীমাবদ্ধতা কিংবা দীর্ঘ পথচলার ক্লান্তি—জীবিকার প্রয়োজনে সবকিছুর সঙ্গেই প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয় তাঁকে।
দুর্ঘটনায় বদলে যায় জীবনের গতিপথ
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১২ বছর আগে কেশবপুরের মধ্যকুল পাম্প এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় ডান হাত হারান কল্লোল। দুর্ঘটনার সময় তিনি অনার্স পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছিলেন। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়ে ঘটে যাওয়া সেই দুর্ঘটনা তাঁর স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়।
তবে শারীরিক অক্ষমতাকে জীবনের শেষ পরিণতি হিসেবে মেনে নেননি তিনি। নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয়ে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। হারানো হাতের শূন্যতা নিয়েও ধরে রাখেন পড়াশোনার স্বপ্ন।
বাম হাতে লিখেই অর্জন করেছেন উচ্চশিক্ষা
দুর্ঘটনার পরও শিক্ষাজীবনে হাল ছাড়েননি কল্লোল। বাম হাতে লিখে খুলনার আজম খান সরকারি কমার্স কলেজ থেকে অনার্স সম্পন্ন করেন। পরে যশোরের সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁর এই শিক্ষাগত সাফল্য প্রমাণ করে, সুযোগ ও সহায়ক পরিবেশ পেলে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা অনেক ক্ষেত্রেই মানুষের অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে রাখতে পারে না।
কিন্তু উচ্চশিক্ষা অর্জনের পরও নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ তাঁর জীবনে কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। সংসারের প্রয়োজন মেটাতে শেষ পর্যন্ত বেছে নিতে হয়েছে পথে পথে পণ্য বিক্রির কাজ। প্রতিদিনের উপার্জন দিয়েই পরিবারের খরচ চালানোর চেষ্টা করেন তিনি।
ভিক্ষা নয়, নিজের শ্রমেই বাঁচতে চান
নিজের জীবনসংগ্রাম সম্পর্কে কল্লোল কুমার দাস বলেন, “দুর্ঘটনায় এক হাত হারিয়েছি, কিন্তু কাজ করার শক্তি ও ইচ্ছা হারাইনি। ভিক্ষা করতে চাই না। নিজের পরিশ্রমে উপার্জন করে পরিবারের দায়িত্ব পালন করতে চাই।”
তাঁর এই বক্তব্যে ফুটে ওঠে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার দৃঢ় প্রত্যয়। শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও অন্যের ওপর নির্ভর না করে নিজের শ্রমে জীবিকা নির্বাহের যে চেষ্টা তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন, তা নিঃসন্দেহে সম্মানের দাবি রাখে।
উচ্চশিক্ষিত প্রতিবন্ধী মানুষের কর্মসংস্থান কতটা সহজ?
উচ্চশিক্ষিত হয়েও জীবিকার প্রয়োজনে প্রতিদিন পথে নামতে হওয়া তাঁর বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শিক্ষা অর্জনের পাশাপাশি যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কর্মক্ষেত্রকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করা গেলে তাঁদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা সমাজের উন্নয়নেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
কল্লোলের জীবন কেবল একজন ব্যক্তির দুঃখ-কষ্ট কিংবা সংগ্রামের গল্প নয়; এটি শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উপযোগী কর্মসংস্থান, দক্ষতার মূল্যায়ন এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাও সামনে আনে।
কেশবপুরের কল্লোল কুমার দাসের পথচলা তাই শুধু প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই নয়, বরং নিজের মর্যাদা অটুট রেখে বেঁচে থাকার এক নিরন্তর প্রচেষ্টা। এক হাতে বেকারির পণ্য নিয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়ানো এই মানুষটির জীবন আমাদের শেখায়—শারীরিক সীমাবদ্ধতা জীবনের পথ কঠিন করতে পারে, কিন্তু দৃঢ় মনোবল ও পরিশ্রম মানুষকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জোগায়।