কাওছার হোসেন: দেশে জ্বর, সর্দি-কাশি, ডায়রিয়া, অ্যালার্জি বা সাধারণ মৌসুমি রোগের প্রকোপ বাড়লেও অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিক চিকিৎসার অভাবেই রোগীর অবস্থা দ্রুত খারাপ হয়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব সাধারণ সমস্যায় আতঙ্কিত হওয়ার আগে প্রাথমিক চিকিৎসার সঠিক ধারণা থাকলে রোগ নিয়ন্ত্রণ অনেক সহজ হয়। একজন সি-ফার্মাসিস্টের জনস্বার্থমূলক পরামর্শ অনুযায়ী ন্যূনতম চিকিৎসা–ব্যবস্থা ঘরে থাকাই রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
জ্বর, শরীর ব্যথা বা ভাইরাল ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো উপসর্গ দেখা দিলে প্রথম যে ওষুধটি নিরাপদ হিসেবে বিবেচিত হয় তা হলো প্যারাসিটামল (500mg/650mg)। নির্দিষ্ট ডোজ অনুযায়ী সেবন করলেই তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। তবে বিশেষ সতর্কতা হলো—NSAID গ্রুপের ডেক্সকেটোপ্রোফেন, আইবুপ্রোফেন, ন্যাপ্রোক্সেন বা ডাইক্লোফেনাকের মতো ওষুধ ভাইরাল জ্বরের শুরুতেই না নেওয়াই উত্তম। এগুলো পাকস্থলীতে সমস্যা তৈরি করার পাশাপাশি কিডনির ওপরেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
ঠান্ডা বা কাশির ক্ষেত্রে রোগীর কাশির প্রকার বুঝে ওষুধ নির্বাচন করতে হয়। শুকনো কাশিতে ডেক্সট্রোমেথরফান জাতীয় অ্যান্টিটাসিভ সিরাপ কার্যকর, অন্যদিকে কফযুক্ত বা ভেজা কাশিতে কাজ করে এক্সপেক্টোরেন্ট বা মিউকোলাইটিক সিরাপ—যেমন গুয়াইফেনেসিন বা অ্যাসিটাইলসিস্টেইন। নাক বন্ধ বা গলাব্যথা হলে স্যালাইন নাক স্প্রে ব্যবহার করা একটি নিরাপদ প্রাথমিক ব্যবস্থা।
ডায়রিয়া বা বমিভাবের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো হঠাৎ পানিশূন্যতা। তাই রোগের শুরু থেকেই ORS, স্যালাইন পানি, ডাবের পানি বা লবণ-চিনি মেশানো পানি খাওয়ানো জরুরি। বেশিরভাগ ডায়রিয়া ভাইরাল হওয়ায় অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন পড়ে না, তাই পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।
ত্বকে চুলকানি, র্যাশ বা অ্যালার্জির মতো উপসর্গ দেখা দিলে সেট্রিজিন বা লোরাটাডিন জাতীয় অ্যান্টিহিস্টামিন উপকারী। ত্বকে লালভাব বা জ্বালাপোড়ায় ক্যালামাইন লোশন ব্যবহার করা যায়। তবে ক্ষতস্থানে পুঁজ, গভীর ক্ষত বা দ্রুত ছড়িয়ে পড়া সংক্রমণ দেখা দিলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।
অম্বল, বুকজ্বালা বা পেটব্যথার মতো গ্যাস্ট্রিক সমস্যায় সাধারণ অ্যান্টাসিড বা ওমিপ্রাজল–ফ্যামোটিডিনের মতো ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে দীর্ঘস্থায়ী পেটব্যথা, রক্তবমি বা কালো পায়খানা—এসবই জরুরি চিকিৎসার লক্ষণ, যেখানে ঘরোয়া চিকিৎসা নয়, চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়াই সমাধান।
শিশু, গর্ভবতী নারী ও বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে ওষুধ ব্যবহারে অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন। এসব রোগীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক কম হওয়ায় ডোজ, ওষুধের ধরন এবং তরল গ্রহণের পরিমাণ নির্ধারণ করতে হয় আরও সতর্কভাবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে।
বাড়িতে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় কিছু সরঞ্জাম থাকলে তাৎক্ষণিক সেবা দেওয়া অনেক সহজ হয়। থার্মোমিটার, ORS, প্যারাসিটামল, স্যালাইন নাক স্প্রে, ব্যান্ডেজ, গজ, সাধারণ অ্যান্টিসেপটিক, গ্লাভস এবং মশা প্রতিরোধক—এসব ন্যূনতম সরঞ্জাম রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে বিশেষজ্ঞরা সবচেয়ে বেশি সতর্ক করেন। নিজের মতো করে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন, অসম্পূর্ণ কোর্স বন্ধ করা বা ভুল ডোজ নেওয়া ভবিষ্যতে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স তৈরি করে, যা চিকিৎসাকে আরও জটিল করে তোলে। তাই অ্যান্টিবায়োটিক সবসময় পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ ছাড়া নেওয়া উচিত নয়।
সবশেষে বলা যায়, সাধারণ রোগে সঠিক প্রাথমিক চিকিৎসা রোগীকে সুস্থতার দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আতঙ্কে ভুল সিদ্ধান্ত না নিয়ে সঠিক তথ্য জানা ও প্রয়োগ করাই রোগ প্রতিরোধ এবং নিরাপদ প্রাথমিক চিকিৎসার মূল উদ্দেশ্য।