নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের ইতিহাসে আজ রচিত হলো এক নতুন অধ্যায়—স্বৈরশাসনের অবসান ও গণতান্ত্রিক প্রত্যাবর্তনের এক অবিস্মরণীয় দিন হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে ৫ আগস্ট ২০২৪।
দীর্ঘ ১৬ বছরের একনায়কতান্ত্রিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে এদিন পদত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তিনি ছোট বোন শেখ রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে সামরিক হেলিকপ্টারে ভারতের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন।
রাজপথে জনস্রোত, কারফিউ ভেঙে বিজয়ের মিছিল: সকালের সূর্য ওঠার আগেই রাজধানীমুখী হয় হাজারো মানুষের পদযাত্রা। ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে সাড়া দিয়ে দেশের নানা প্রান্ত থেকে লাখো মানুষ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাধা, কারফিউ ও রাস্তায় বসানো ব্যারিকেড উপেক্ষা করে ঢাকায় প্রবেশ করেন। রাজধানীর শাহবাগ, ফার্মগেট, সায়েন্স ল্যাব, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে জড়ো হয় বিক্ষুব্ধ জনতা। আন্দোলনকারীরা রাজধানীর প্রধান সড়কগুলো দখলে নিয়ে বিজয়ের মিছিল করে। দুপুরের পর তারা গণভবনে প্রবেশ করে ‘জনতার বিজয়’ ঘোষণা করে।
বিজয় রক্তমাখা, আত্মত্যাগের অগ্নিপরীক্ষা: এই দিনে শুধু বিজয় নয়, ছিল আত্মত্যাগের নির্মম স্মারকও। জুলাই মাসজুড়ে আন্দোলন দমন করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারদলীয় সংগঠন যুবলীগ-ছাত্রলীগের ক্যাডারদের হামলায় নিহত হন শতাধিক আন্দোলনকারী। ৫ আগস্ট সকালেও পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান একাধিক তরুণ। শত শত মানুষ আহত হন। শহীদদের রক্তে রঞ্জিত এই পথই আজ গণজাগরণের আলোকবর্তিকা হয়ে উঠেছে।
“শেখ হাসিনা পালায় না”—বহুল উচ্চারিত দাবি ভেঙে পড়ে: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বহুবার উচ্চারণ করেছেন, “আমি পালিয়ে যাই না।” কিন্তু বাস্তবতা তার বিপরীত চিত্রই হাজির করেছে জাতির সামনে। বিস্তৃত জনরোষ, বিক্ষোভ ও চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত তিনি পদত্যাগ করে দেশের মাটি ত্যাগে বাধ্য হন। জনগণের রায়ে যেন রচিত হলো ইতিহাসের এক নির্মম অথচ ন্যায়সঙ্গত সমাপ্তি।
সেনাবাহিনীর আশ্বাস, স্থিতিশীলতা বজায় রাখার আহ্বান: বিকেল ৪টায় টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান শেখ হাসিনার পদত্যাগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। তিনি জনগণকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান এবং জাতীয় স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সংহতির সঙ্গে চলার অনুরোধ করেন।
কোটাবিরোধী আন্দোলন থেকে গণঅভ্যুত্থান: ২০২৪ সালের জুনে হাইকোর্ট কর্তৃক কোটা পুনর্বহালের রায়কে কেন্দ্র করে শুরু হয় ছাত্রদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন। কিন্তু সরকারের দমনমূলক ব্যবস্থার কারণে আন্দোলন দ্রুত বিস্তৃত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। একসময় তা রূপ নেয় পূর্ণাঙ্গ গণঅভ্যুত্থানে। বিগত এক দশকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, বাকস্বাধীনতা হরণের মতো একাধিক বিতর্কিত নীতির বিরুদ্ধে জমে ওঠা ক্ষোভ এই আন্দোলনে নতুন প্রাণ পায়।
“নতুন বাংলাদেশ” — গণতন্ত্র, মানবতা ও ন্যায়ের পথে যাত্রা: ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশ প্রবেশ করেছে নতুন এক ধারায়—যেখানে নাগরিক অধিকার, মানবিক মূল্যবোধ ও গণতান্ত্রিক চেতনা হবে রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি। লাখো শহীদের আত্মত্যাগ যেন বৃথা না যায়—এই প্রতিশ্রুতি নিয়েই শুরু হয়েছে নতুন বাংলাদেশের পথচলা।